ঢাকা ১১:৩২ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কারাবন্দী বোঝা নয়, রাষ্ট্রের সম্পদ, কারাগার হোক পুনর্বাসন ও উৎপাদনের কেন্দ্র

  • Reporter Name
  • Update Time : ০৭:৫৮:৪০ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ৮ Time View

মো: খায়রুল ইসলাম :

কারাগারকে শুধু ব্যয়ের কেন্দ্র না বানিয়ে সংশোধন, দক্ষতা উন্নয়ন, পুনর্বাসন ও উৎপাদনের কেন্দ্রবিন্দু করে গড়ে তোলা সম্ভব। কারাগার শব্দটির সঙ্গে আমাদের মনে সাধারণত বন্দিত্ব, শাস্তি ও অপরাধের ধারণাই ভেসে ওঠে। কিন্তু আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় কারাগারের উদ্দেশ্য শুধু একজন অপরাধীকে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা নয়; তাকে সংশোধন করা, দক্ষ করে তোলা এবং সাজা শেষে সমাজে পুনর্বাসনের উপযোগী করে তোলাও এর অন্যতম দায়িত্ব। এই জায়গা থেকেই একটি প্রশ্ন সামনে আসতে পারে, কারাবন্দীদের শুধু রাষ্ট্রের ব্যয়ের বোঝা হিসেবে না দেখে তাদের একটি অংশকে কি উৎপাদনশীল জনশক্তিতে পরিণত করা সম্ভব?

প্রসঙ্গটি নিয়ে এখন গুরুত্ব দিয়ে ভাবার সময় এসেছে। বাংলাদেশের কারাগারগুলোর বর্তমান চিত্র বিষয়টির গুরুত্ব আরও স্পষ্ট করে। সর্বশেষ পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ৭ জুন ২০২৬ তারিখে দেশের কারাগারগুলোতে মোট ৭৭ হাজার ৪০ জন বন্দী ছিলেন। এ হিসাব গত তিন মাসে বেড়েছে কয়েক হাজার। এর মধ্যে নারী বন্দীর সংখ্যা মোট বন্দীর প্রায় ২ দশমিক ৭ শতাংশ, অর্থাৎ আনুমানিক ২ হাজার ৮০ জন।
কারাগারে নারী ও পুরুষের পাশাপাশি বয়সভেদে বিভিন্ন শ্রেণির বন্দীও রয়েছেন। কারা অধিদপ্তরের শ্রেণিবিন্যাসে নারী বন্দীর পাশাপাশি ২১ বছরের নিচের পুরুষ বন্দী এবং বয়ঃসন্ধিতে উপনীত না হওয়া বন্দীদের আলাদা শ্রেণি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে কিশোর বন্দীদের বর্তমান নির্ভুল সংখ্যা আলাদাভাবে সরকারি হালনাগাদ পরিসংখ্যানের মাধ্যমে প্রকাশ করা প্রয়োজন। এখানে আরও একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি কারাগারে থাকা সবাই দণ্ডপ্রাপ্ত নন। বিচারাধীন হাজতি এবং দণ্ডপ্রাপ্ত কয়েদি দুই শ্রেণির মানুষই কারাগারে থাকেন। ফলে কর্মসংস্থান বা উৎপাদনমূলক কর্মসূচি গ্রহণের ক্ষেত্রেও তাদের আইনগত অবস্থান, বয়স, শারীরিক সক্ষমতা ও অন্যান্য বিষয় বিবেচনায় পৃথক নীতিমালা প্রয়োজন।

একজন বন্দী কারাগারে অবস্থান করার সময় তার খাবার, নিরাপত্তা, চিকিৎসা, পোশাক, আবাসনসহ বিভিন্ন খাতে রাষ্ট্রের নিয়মিত অর্থ ব্যয় হয়। দীর্ঘমেয়াদি সাজাপ্রাপ্ত বন্দীদের ক্ষেত্রে এই ব্যয় দীর্ঘ সময় ধরে চলতে থাকে। অন্যদিকে এসব বন্দীর অনেকেই শারীরিকভাবে সক্ষম এবং কাজ শেখার উপযোগী। তাহলে তাদের সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় রেখে শুধু ব্যয় করার পরিবর্তে কেন তাদের একটি অংশকে দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতার সঙ্গে যুক্ত করা হবে না? কারাগারে থাকা সময়টিকে যদি সংশোধন, শিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ ও কর্মদক্ষতা অর্জনের সময়ে পরিণত করা যায়, তাহলে একই সঙ্গে রাষ্ট্র, বন্দী ও সমাজ তিন পক্ষই লাভবান হতে পারে। এ জন্য দেশের কারাগারগুলোতে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে ‘কারা কর্মসংস্থান’ নামে একটি পরিকল্পিত কর্মসূচি গ্রহণ করা যেতে পারে।

প্রাথমিকভাবে বড় কোনো শিল্পকারখানা স্থাপনের প্রয়োজন নেই। কম মূলধন ও সহজ প্রযুক্তিনির্ভর ছোট ছোট প্রকল্প দিয়ে কার্যক্রম শুরু করা যেতে পারে।
যেমন: বাঁশ ও বেতের হস্তশিল্প; কাঠের আসবাবপত্র ও ব্যবহার্য সামগ্রী; মোমবাতি উৎপাদন; আগরবাতি উৎপাদন; মশার কয়েল; কাগজ ও কাগজজাত পণ্য;
পোশাক ও সেলাই; ব্যাগ ও হস্তশিল্প; প্যাকেজিং সামগ্রী;
কৃষি ও নার্সারি; বিভিন্ন ক্ষুদ্র কারিগরি পণ্য;
স্থানীয় চাহিদাভিত্তিক অন্যান্য উৎপাদন।
প্রতিটি কারাগারের অবস্থান, স্থানীয় কাঁচামাল, বাজারের চাহিদা এবং বন্দীদের দক্ষতা বিবেচনা করে আলাদা আলাদা উৎপাদন ইউনিট গড়ে তোলা যেতে পারে। বর্তমান সময়ে বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন পণ্য মিনারেল ওয়াটার ও কোমলপানি যা বাজারে চাহিদা প্রচুর। এগুলোও যুক্ত করা যেতে পারে।

বন্দী শ্রম নয়, দক্ষতা ও পুনর্বাসন। এখানে একটি বিষয় অত্যন্ত পরিষ্কার থাকা দরকার ‘কারা কর্মসংস্থান’ কোনোভাবেই বন্দীদের ওপর জোরপূর্বক শ্রম চাপিয়ে দেওয়ার প্রকল্প হওয়া উচিত নয়। মানবাধিকার, শ্রমের মর্যাদা, নিরাপত্তা এবং প্রচলিত আইন মেনেই কর্মসূচি পরিচালনা করতে হবে। যারা আইনগতভাবে ও শারীরিকভাবে উপযুক্ত এবং কর্মসূচিতে অংশগ্রহণে আগ্রহী, তাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে স্বেচ্ছাভিত্তিকভাবে কাজে যুক্ত করার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। কাজের ধরন অনুযায়ী উপযুক্ত পারিশ্রমিক, সঞ্চয় বা পুনর্বাসন সুবিধার ব্যবস্থা থাকতে পারে। উৎপাদন থেকে অর্জিত অর্থের একটি অংশ বন্দীর নামে সঞ্চয় করে রাখা যেতে পারে, যা সাজা শেষে মুক্তির পর তার পুনর্বাসন, পরিবারকে সহায়তা কিংবা ক্ষুদ্র ব্যবসা শুরু করার কাজে ব্যবহার করা সম্ভব।

কারা কর্মসংস্থানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হচ্ছে এর অর্থনৈতিক সম্ভাবনা। কারাগারে উৎপাদিত মানসম্মত পণ্য সরকারি প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় সংস্থার প্রয়োজন মেটাতে ব্যবহার করা যেতে পারে। পাশাপাশি আইনসম্মত ও স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনায় এসব পণ্য বাজারজাত করা সম্ভব। দেশের বিভিন্ন কারাগারে কয়েক হাজার বন্দী পর্যায়ক্রমে উৎপাদন কার্যক্রমে যুক্ত হলে সম্মিলিত উৎপাদনের পরিমাণ ছোট থাকবে না। সঠিক ব্যবস্থাপনা, বাজারজাতকরণ ও হিসাবরক্ষণ নিশ্চিত করা গেলে এখান থেকে উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সৃষ্টি হতে পারে। অর্থাৎ কারাগারকে শুধু ‘ব্যয়ের খাত’ হিসেবে না দেখে ধীরে ধীরে ‘সংশোধন ও উৎপাদন কেন্দ্র’ হিসেবে গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে।

তবে এখান থেকে কত টাকা আয় হবে এ বিষয়ে অনুমাননির্ভর কোনো অঙ্ক বলা ঠিক হবে না। প্রথমে একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক সমীক্ষা প্রয়োজন। কতজন বন্দী কর্মক্ষম, কতজনকে প্রশিক্ষণ দেওয়া যাবে, উৎপাদন ব্যয় কত, বাজারমূল্য কত এবং প্রকৃত লাভ কত এসব হিসাবের ভিত্তিতেই সম্ভাব্য রাজস্ব নির্ধারণ করা যেতে পারে।

উৎপাদন থেকে অর্জিত অর্থ কীভাবে ব্যবহার হবে, সে বিষয়ে স্বচ্ছ নীতিমালা থাকতে হবে। সম্ভাব্যভাবে আয়ের একটি অংশ ১. উৎপাদনের কাঁচামাল ও পরিচালন ব্যয়ে ২. বন্দীর পারিশ্রমিক বা সঞ্চয়ে ৩. তার পরিবারের সহায়তায় ৪. কারা কল্যাণ ও পুনর্বাসন তহবিলে এবং ৫. রাষ্ট্রীয় রাজস্বে ব্যবহার করা যেতে পারে।

প্রতিটি উৎপাদন ইউনিটের আয়-ব্যয়, পণ্য উৎপাদন, বিক্রয় ও লাভের হিসাব ডিজিটাল পদ্ধতিতে সংরক্ষণ এবং নিয়মিত অডিটের আওতায় আনতে হবে। এতে অনিয়ম ও দুর্নীতির সুযোগ কমবে। নারী বন্দীদের জন্য তাদের সক্ষমতা, নিরাপত্তা ও প্রয়োজন বিবেচনায় আলাদা কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম নেওয়া যেতে পারে। সেলাই, পোশাক, হস্তশিল্প, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, প্যাকেজিংসহ বিভিন্ন নিরাপদ ও বাজারমুখী কাজ তাদের জন্য উপযোগী হতে পারে।
অন্যদিকে কিশোর বন্দীদের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও সংবেদনশীল। তাদের ক্ষেত্রে উৎপাদনের চেয়ে শিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ, মানসিক বিকাশ, কাউন্সেলিং এবং পুনর্বাসনকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। তাদের যেন কোনোভাবেই শোষণমূলক শ্রমে যুক্ত করা না হয়, সেটি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কারা কর্মসংস্থানের সবচেয়ে বড় সুফল হতে পারে বন্দীদের ভবিষ্যৎ পুনর্বাসন। সাজা শেষে সমাজে ফিরে এসে অনেকেই কর্মসংস্থানের অভাবে নতুন করে অপরাধের ঝুঁকিতে পড়তে পারেন। কারাগারে থাকতেই যদি তারা কোনো পেশায় দক্ষতা অর্জন করেন, তাহলে মুক্তির পর বৈধভাবে জীবিকা নির্বাহের সুযোগ তৈরি হবে।
একজন বন্দী যদি কারাগারে থেকে কাঠের কাজ শেখেন, বাঁশ-বেতের পণ্য তৈরি শেখেন, পোশাক তৈরি শেখেন কিংবা কোনো কারিগরি দক্ষতা অর্জন করেন, তাহলে সমাজে ফেরার সময় তিনি অন্তত একটি পেশাগত পরিচয় নিয়ে ফিরতে পারবেন।
এভাবে কারা কর্মসংস্থান হতে পারে অপরাধী সংশোধন ও পুনর্বাসনের কার্যকর হাতিয়ার।

আর এ সকল উদ্যোগে প্রথমে পাইলট প্রকল্প গ্রহন করতে পারে সরকার। একদিনে দেশের সব কারাগারে এ ধরনের ব্যবস্থা চালু করা সম্ভব নয়। প্রথমে কয়েকটি কারাগারে পরীক্ষামূলকভাবে ‘কারা কর্মসংস্থান’ প্রকল্প চালু করা যেতে পারে। সেখানে যাচাই করা হবে—
কতজন বন্দী কাজে অংশ নিতে আগ্রহী; কতজনকে প্রশিক্ষণ দেওয়া সম্ভব; কোন ধরনের পণ্যের বাজার রয়েছে; উৎপাদন ব্যয় কত; বিক্রয়মূল্য ও সম্ভাব্য আয় কত; বন্দীদের পারিশ্রমিক কীভাবে নির্ধারিত হবে;
এবং প্রকল্পের মাধ্যমে পুনর্বাসনের কী ফল পাওয়া যাচ্ছে।

পরীক্ষামূলক প্রকল্প সফল হলে পর্যায়ক্রমে দেশের অন্যান্য কারাগারে তা সম্প্রসারণ করা যেতে পারে।
প্রয়োজন নির্ভুল জাতীয় ডাটাবেস এ ধরনের উদ্যোগের আগে দেশের কারাগারগুলোর বন্দীদের নিয়ে একটি হালনাগাদ জাতীয় ডাটাবেস তৈরি করা জরুরি।
বয়স, লিঙ্গ, বিচারাধীন বা দণ্ডপ্রাপ্ত, সাজার মেয়াদ, শিক্ষাগত যোগ্যতা, পূর্বের পেশা, শারীরিক সক্ষমতা, কারিগরি দক্ষতা এবং কোন ধরনের কাজে আগ্রহ, এসব তথ্য সংরক্ষণ করা গেলে প্রত্যেক বন্দীর জন্য উপযুক্ত প্রশিক্ষণ ও কর্মপরিকল্পনা তৈরি করা সম্ভব হবে। তখন বোঝা যাবে, ৭৭ হাজারের বেশি বন্দীর মধ্যে কতজন বাস্তবে কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচিতে যুক্ত হওয়ার উপযুক্ত।

কারাগার হতে পারে বন্দী সংশোধন ও সম্ভাবনার কেন্দ্র।রাষ্ট্রের খেয়াল রাখতে হবে, একজন বন্দীকে শাস্তি দেওয়ার পাশাপাশি তাকে সংশোধনের সুযোগ দেওয়াও রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কারাগারে থাকা মানুষগুলোকে শুধু অপরাধের পরিচয়ে দেখলে তাদের সম্ভাবনার একটি বড় অংশ অস্বীকার করা হয়। রাষ্ট্র যদি একজন বন্দীর পেছনে বছরের পর বছর অর্থ ব্যয় করেই থাকে, তাহলে সেই সময়টুকুকে কেন তার শিক্ষা, দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতার সঙ্গে যুক্ত করা হবে না?
কারাগার যেন শুধু তালাবদ্ধ দরজার ওপারে থাকা একটি ব্যয়বহুল প্রতিষ্ঠান না হয়; বরং সেখানে তৈরি হোক দক্ষতা, দায়িত্ববোধ, কর্মসংস্থান ও নতুন জীবনের প্রস্তুতি।

মনে রাখা উচিত আজ যে মানুষটি কারাগারে বন্দী, আগামীকাল সে হয়তো সমাজের একজন কর্মজীবী মানুষ হতে পারে। রাষ্ট্র যদি সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারে, তাহলে একজন বন্দী শুধু নিজের জীবনই বদলাবেন না রাষ্ট্রের ব্যয়ের একটি অংশকে উৎপাদনমূলক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে রূপান্তর করার সুযোগও সৃষ্টি হবে।

সুতরাং সময় এসেছে বিষয়টি নিয়ে আবেগ নয়, বাস্তবতা, মানবাধিকার, অর্থনীতি ও পুনর্বাসনের সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গিতে একটি জাতীয় নীতিমালা প্রণয়নের। ‘কারা কর্মসংস্থান’ হতে পারে সেই নতুন ভাবনারই সূচনা যেখানে কারাগার শুধু শাস্তির স্থান নয়, সংশোধন, দক্ষতা অর্জন, পুনর্বাসন এবং সম্ভাব্য উৎপাদনের কেন্দ্র হয়ে উঠবে।

লেখক: আহমেদ আবু জাফর, চেয়ারম্যান, ট্রাস্টি বোর্ড, বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরাম ও সভাপতি, সাংবাদিক নির্যাতন প্রতিরোধ কমিটি, বাংলাদেশ। ইমেইল jaforsbds@gmail.com, 01712306501

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

কারাবন্দী বোঝা নয়, রাষ্ট্রের সম্পদ, কারাগার হোক পুনর্বাসন ও উৎপাদনের কেন্দ্র

কারাবন্দী বোঝা নয়, রাষ্ট্রের সম্পদ, কারাগার হোক পুনর্বাসন ও উৎপাদনের কেন্দ্র

Update Time : ০৭:৫৮:৪০ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মো: খায়রুল ইসলাম :

কারাগারকে শুধু ব্যয়ের কেন্দ্র না বানিয়ে সংশোধন, দক্ষতা উন্নয়ন, পুনর্বাসন ও উৎপাদনের কেন্দ্রবিন্দু করে গড়ে তোলা সম্ভব। কারাগার শব্দটির সঙ্গে আমাদের মনে সাধারণত বন্দিত্ব, শাস্তি ও অপরাধের ধারণাই ভেসে ওঠে। কিন্তু আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় কারাগারের উদ্দেশ্য শুধু একজন অপরাধীকে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা নয়; তাকে সংশোধন করা, দক্ষ করে তোলা এবং সাজা শেষে সমাজে পুনর্বাসনের উপযোগী করে তোলাও এর অন্যতম দায়িত্ব। এই জায়গা থেকেই একটি প্রশ্ন সামনে আসতে পারে, কারাবন্দীদের শুধু রাষ্ট্রের ব্যয়ের বোঝা হিসেবে না দেখে তাদের একটি অংশকে কি উৎপাদনশীল জনশক্তিতে পরিণত করা সম্ভব?

প্রসঙ্গটি নিয়ে এখন গুরুত্ব দিয়ে ভাবার সময় এসেছে। বাংলাদেশের কারাগারগুলোর বর্তমান চিত্র বিষয়টির গুরুত্ব আরও স্পষ্ট করে। সর্বশেষ পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ৭ জুন ২০২৬ তারিখে দেশের কারাগারগুলোতে মোট ৭৭ হাজার ৪০ জন বন্দী ছিলেন। এ হিসাব গত তিন মাসে বেড়েছে কয়েক হাজার। এর মধ্যে নারী বন্দীর সংখ্যা মোট বন্দীর প্রায় ২ দশমিক ৭ শতাংশ, অর্থাৎ আনুমানিক ২ হাজার ৮০ জন।
কারাগারে নারী ও পুরুষের পাশাপাশি বয়সভেদে বিভিন্ন শ্রেণির বন্দীও রয়েছেন। কারা অধিদপ্তরের শ্রেণিবিন্যাসে নারী বন্দীর পাশাপাশি ২১ বছরের নিচের পুরুষ বন্দী এবং বয়ঃসন্ধিতে উপনীত না হওয়া বন্দীদের আলাদা শ্রেণি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে কিশোর বন্দীদের বর্তমান নির্ভুল সংখ্যা আলাদাভাবে সরকারি হালনাগাদ পরিসংখ্যানের মাধ্যমে প্রকাশ করা প্রয়োজন। এখানে আরও একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি কারাগারে থাকা সবাই দণ্ডপ্রাপ্ত নন। বিচারাধীন হাজতি এবং দণ্ডপ্রাপ্ত কয়েদি দুই শ্রেণির মানুষই কারাগারে থাকেন। ফলে কর্মসংস্থান বা উৎপাদনমূলক কর্মসূচি গ্রহণের ক্ষেত্রেও তাদের আইনগত অবস্থান, বয়স, শারীরিক সক্ষমতা ও অন্যান্য বিষয় বিবেচনায় পৃথক নীতিমালা প্রয়োজন।

একজন বন্দী কারাগারে অবস্থান করার সময় তার খাবার, নিরাপত্তা, চিকিৎসা, পোশাক, আবাসনসহ বিভিন্ন খাতে রাষ্ট্রের নিয়মিত অর্থ ব্যয় হয়। দীর্ঘমেয়াদি সাজাপ্রাপ্ত বন্দীদের ক্ষেত্রে এই ব্যয় দীর্ঘ সময় ধরে চলতে থাকে। অন্যদিকে এসব বন্দীর অনেকেই শারীরিকভাবে সক্ষম এবং কাজ শেখার উপযোগী। তাহলে তাদের সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় রেখে শুধু ব্যয় করার পরিবর্তে কেন তাদের একটি অংশকে দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতার সঙ্গে যুক্ত করা হবে না? কারাগারে থাকা সময়টিকে যদি সংশোধন, শিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ ও কর্মদক্ষতা অর্জনের সময়ে পরিণত করা যায়, তাহলে একই সঙ্গে রাষ্ট্র, বন্দী ও সমাজ তিন পক্ষই লাভবান হতে পারে। এ জন্য দেশের কারাগারগুলোতে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে ‘কারা কর্মসংস্থান’ নামে একটি পরিকল্পিত কর্মসূচি গ্রহণ করা যেতে পারে।

প্রাথমিকভাবে বড় কোনো শিল্পকারখানা স্থাপনের প্রয়োজন নেই। কম মূলধন ও সহজ প্রযুক্তিনির্ভর ছোট ছোট প্রকল্প দিয়ে কার্যক্রম শুরু করা যেতে পারে।
যেমন: বাঁশ ও বেতের হস্তশিল্প; কাঠের আসবাবপত্র ও ব্যবহার্য সামগ্রী; মোমবাতি উৎপাদন; আগরবাতি উৎপাদন; মশার কয়েল; কাগজ ও কাগজজাত পণ্য;
পোশাক ও সেলাই; ব্যাগ ও হস্তশিল্প; প্যাকেজিং সামগ্রী;
কৃষি ও নার্সারি; বিভিন্ন ক্ষুদ্র কারিগরি পণ্য;
স্থানীয় চাহিদাভিত্তিক অন্যান্য উৎপাদন।
প্রতিটি কারাগারের অবস্থান, স্থানীয় কাঁচামাল, বাজারের চাহিদা এবং বন্দীদের দক্ষতা বিবেচনা করে আলাদা আলাদা উৎপাদন ইউনিট গড়ে তোলা যেতে পারে। বর্তমান সময়ে বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন পণ্য মিনারেল ওয়াটার ও কোমলপানি যা বাজারে চাহিদা প্রচুর। এগুলোও যুক্ত করা যেতে পারে।

বন্দী শ্রম নয়, দক্ষতা ও পুনর্বাসন। এখানে একটি বিষয় অত্যন্ত পরিষ্কার থাকা দরকার ‘কারা কর্মসংস্থান’ কোনোভাবেই বন্দীদের ওপর জোরপূর্বক শ্রম চাপিয়ে দেওয়ার প্রকল্প হওয়া উচিত নয়। মানবাধিকার, শ্রমের মর্যাদা, নিরাপত্তা এবং প্রচলিত আইন মেনেই কর্মসূচি পরিচালনা করতে হবে। যারা আইনগতভাবে ও শারীরিকভাবে উপযুক্ত এবং কর্মসূচিতে অংশগ্রহণে আগ্রহী, তাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে স্বেচ্ছাভিত্তিকভাবে কাজে যুক্ত করার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। কাজের ধরন অনুযায়ী উপযুক্ত পারিশ্রমিক, সঞ্চয় বা পুনর্বাসন সুবিধার ব্যবস্থা থাকতে পারে। উৎপাদন থেকে অর্জিত অর্থের একটি অংশ বন্দীর নামে সঞ্চয় করে রাখা যেতে পারে, যা সাজা শেষে মুক্তির পর তার পুনর্বাসন, পরিবারকে সহায়তা কিংবা ক্ষুদ্র ব্যবসা শুরু করার কাজে ব্যবহার করা সম্ভব।

কারা কর্মসংস্থানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হচ্ছে এর অর্থনৈতিক সম্ভাবনা। কারাগারে উৎপাদিত মানসম্মত পণ্য সরকারি প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় সংস্থার প্রয়োজন মেটাতে ব্যবহার করা যেতে পারে। পাশাপাশি আইনসম্মত ও স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনায় এসব পণ্য বাজারজাত করা সম্ভব। দেশের বিভিন্ন কারাগারে কয়েক হাজার বন্দী পর্যায়ক্রমে উৎপাদন কার্যক্রমে যুক্ত হলে সম্মিলিত উৎপাদনের পরিমাণ ছোট থাকবে না। সঠিক ব্যবস্থাপনা, বাজারজাতকরণ ও হিসাবরক্ষণ নিশ্চিত করা গেলে এখান থেকে উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সৃষ্টি হতে পারে। অর্থাৎ কারাগারকে শুধু ‘ব্যয়ের খাত’ হিসেবে না দেখে ধীরে ধীরে ‘সংশোধন ও উৎপাদন কেন্দ্র’ হিসেবে গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে।

তবে এখান থেকে কত টাকা আয় হবে এ বিষয়ে অনুমাননির্ভর কোনো অঙ্ক বলা ঠিক হবে না। প্রথমে একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক সমীক্ষা প্রয়োজন। কতজন বন্দী কর্মক্ষম, কতজনকে প্রশিক্ষণ দেওয়া যাবে, উৎপাদন ব্যয় কত, বাজারমূল্য কত এবং প্রকৃত লাভ কত এসব হিসাবের ভিত্তিতেই সম্ভাব্য রাজস্ব নির্ধারণ করা যেতে পারে।

উৎপাদন থেকে অর্জিত অর্থ কীভাবে ব্যবহার হবে, সে বিষয়ে স্বচ্ছ নীতিমালা থাকতে হবে। সম্ভাব্যভাবে আয়ের একটি অংশ ১. উৎপাদনের কাঁচামাল ও পরিচালন ব্যয়ে ২. বন্দীর পারিশ্রমিক বা সঞ্চয়ে ৩. তার পরিবারের সহায়তায় ৪. কারা কল্যাণ ও পুনর্বাসন তহবিলে এবং ৫. রাষ্ট্রীয় রাজস্বে ব্যবহার করা যেতে পারে।

প্রতিটি উৎপাদন ইউনিটের আয়-ব্যয়, পণ্য উৎপাদন, বিক্রয় ও লাভের হিসাব ডিজিটাল পদ্ধতিতে সংরক্ষণ এবং নিয়মিত অডিটের আওতায় আনতে হবে। এতে অনিয়ম ও দুর্নীতির সুযোগ কমবে। নারী বন্দীদের জন্য তাদের সক্ষমতা, নিরাপত্তা ও প্রয়োজন বিবেচনায় আলাদা কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম নেওয়া যেতে পারে। সেলাই, পোশাক, হস্তশিল্প, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, প্যাকেজিংসহ বিভিন্ন নিরাপদ ও বাজারমুখী কাজ তাদের জন্য উপযোগী হতে পারে।
অন্যদিকে কিশোর বন্দীদের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও সংবেদনশীল। তাদের ক্ষেত্রে উৎপাদনের চেয়ে শিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ, মানসিক বিকাশ, কাউন্সেলিং এবং পুনর্বাসনকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। তাদের যেন কোনোভাবেই শোষণমূলক শ্রমে যুক্ত করা না হয়, সেটি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কারা কর্মসংস্থানের সবচেয়ে বড় সুফল হতে পারে বন্দীদের ভবিষ্যৎ পুনর্বাসন। সাজা শেষে সমাজে ফিরে এসে অনেকেই কর্মসংস্থানের অভাবে নতুন করে অপরাধের ঝুঁকিতে পড়তে পারেন। কারাগারে থাকতেই যদি তারা কোনো পেশায় দক্ষতা অর্জন করেন, তাহলে মুক্তির পর বৈধভাবে জীবিকা নির্বাহের সুযোগ তৈরি হবে।
একজন বন্দী যদি কারাগারে থেকে কাঠের কাজ শেখেন, বাঁশ-বেতের পণ্য তৈরি শেখেন, পোশাক তৈরি শেখেন কিংবা কোনো কারিগরি দক্ষতা অর্জন করেন, তাহলে সমাজে ফেরার সময় তিনি অন্তত একটি পেশাগত পরিচয় নিয়ে ফিরতে পারবেন।
এভাবে কারা কর্মসংস্থান হতে পারে অপরাধী সংশোধন ও পুনর্বাসনের কার্যকর হাতিয়ার।

আর এ সকল উদ্যোগে প্রথমে পাইলট প্রকল্প গ্রহন করতে পারে সরকার। একদিনে দেশের সব কারাগারে এ ধরনের ব্যবস্থা চালু করা সম্ভব নয়। প্রথমে কয়েকটি কারাগারে পরীক্ষামূলকভাবে ‘কারা কর্মসংস্থান’ প্রকল্প চালু করা যেতে পারে। সেখানে যাচাই করা হবে—
কতজন বন্দী কাজে অংশ নিতে আগ্রহী; কতজনকে প্রশিক্ষণ দেওয়া সম্ভব; কোন ধরনের পণ্যের বাজার রয়েছে; উৎপাদন ব্যয় কত; বিক্রয়মূল্য ও সম্ভাব্য আয় কত; বন্দীদের পারিশ্রমিক কীভাবে নির্ধারিত হবে;
এবং প্রকল্পের মাধ্যমে পুনর্বাসনের কী ফল পাওয়া যাচ্ছে।

পরীক্ষামূলক প্রকল্প সফল হলে পর্যায়ক্রমে দেশের অন্যান্য কারাগারে তা সম্প্রসারণ করা যেতে পারে।
প্রয়োজন নির্ভুল জাতীয় ডাটাবেস এ ধরনের উদ্যোগের আগে দেশের কারাগারগুলোর বন্দীদের নিয়ে একটি হালনাগাদ জাতীয় ডাটাবেস তৈরি করা জরুরি।
বয়স, লিঙ্গ, বিচারাধীন বা দণ্ডপ্রাপ্ত, সাজার মেয়াদ, শিক্ষাগত যোগ্যতা, পূর্বের পেশা, শারীরিক সক্ষমতা, কারিগরি দক্ষতা এবং কোন ধরনের কাজে আগ্রহ, এসব তথ্য সংরক্ষণ করা গেলে প্রত্যেক বন্দীর জন্য উপযুক্ত প্রশিক্ষণ ও কর্মপরিকল্পনা তৈরি করা সম্ভব হবে। তখন বোঝা যাবে, ৭৭ হাজারের বেশি বন্দীর মধ্যে কতজন বাস্তবে কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচিতে যুক্ত হওয়ার উপযুক্ত।

কারাগার হতে পারে বন্দী সংশোধন ও সম্ভাবনার কেন্দ্র।রাষ্ট্রের খেয়াল রাখতে হবে, একজন বন্দীকে শাস্তি দেওয়ার পাশাপাশি তাকে সংশোধনের সুযোগ দেওয়াও রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কারাগারে থাকা মানুষগুলোকে শুধু অপরাধের পরিচয়ে দেখলে তাদের সম্ভাবনার একটি বড় অংশ অস্বীকার করা হয়। রাষ্ট্র যদি একজন বন্দীর পেছনে বছরের পর বছর অর্থ ব্যয় করেই থাকে, তাহলে সেই সময়টুকুকে কেন তার শিক্ষা, দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতার সঙ্গে যুক্ত করা হবে না?
কারাগার যেন শুধু তালাবদ্ধ দরজার ওপারে থাকা একটি ব্যয়বহুল প্রতিষ্ঠান না হয়; বরং সেখানে তৈরি হোক দক্ষতা, দায়িত্ববোধ, কর্মসংস্থান ও নতুন জীবনের প্রস্তুতি।

মনে রাখা উচিত আজ যে মানুষটি কারাগারে বন্দী, আগামীকাল সে হয়তো সমাজের একজন কর্মজীবী মানুষ হতে পারে। রাষ্ট্র যদি সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারে, তাহলে একজন বন্দী শুধু নিজের জীবনই বদলাবেন না রাষ্ট্রের ব্যয়ের একটি অংশকে উৎপাদনমূলক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে রূপান্তর করার সুযোগও সৃষ্টি হবে।

সুতরাং সময় এসেছে বিষয়টি নিয়ে আবেগ নয়, বাস্তবতা, মানবাধিকার, অর্থনীতি ও পুনর্বাসনের সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গিতে একটি জাতীয় নীতিমালা প্রণয়নের। ‘কারা কর্মসংস্থান’ হতে পারে সেই নতুন ভাবনারই সূচনা যেখানে কারাগার শুধু শাস্তির স্থান নয়, সংশোধন, দক্ষতা অর্জন, পুনর্বাসন এবং সম্ভাব্য উৎপাদনের কেন্দ্র হয়ে উঠবে।

লেখক: আহমেদ আবু জাফর, চেয়ারম্যান, ট্রাস্টি বোর্ড, বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরাম ও সভাপতি, সাংবাদিক নির্যাতন প্রতিরোধ কমিটি, বাংলাদেশ। ইমেইল jaforsbds@gmail.com, 01712306501